বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হ্যারিয়েট টাবম্যান: দাসত্ব থেকে পালিয়ে শত শত মানুষের মুক্তির পথ দেখানো সাহসী নারী

Series: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

  • Author: Admin
  • September 06, 2026
হ্যারিয়েট টাবম্যান: দাসত্ব থেকে পালিয়ে শত শত মানুষের মুক্তির পথ দেখানো সাহসী নারী
দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে অন্য দাসদের স্বাধীনতার পথে নিয়ে যাওয়া কিংবদন্তি হ্যারিয়েট টাবম্যান

যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথার ইতিহাসে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করা অসংখ্য মানুষের মধ্যে হ্যারিয়েট টাবম্যান এমন এক নাম, যাঁর জীবন বাস্তবতার চেয়েও কখনো কখনো কিংবদন্তির মতো মনে হয়। তিনি নিজে দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে পালিয়েছিলেন, কিন্তু নিরাপদ অঞ্চলে পৌঁছে নিজের মুক্তিতেই থেমে যাননি। বারবার জীবন বিপন্ন করে ফিরে গিয়েছিলেন দাসপ্রথা-নিয়ন্ত্রিত এলাকায়, পরিবার ও অন্য দাসদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন, পরে আমেরিকান গৃহযুদ্ধে ইউনিয়ন বাহিনীর জন্য গোয়েন্দা, পথপ্রদর্শক ও নার্স হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং একটি সামরিক অভিযানে অংশ নিয়ে সাত শতাধিক দাস মানুষের মুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর জীবন তাই শুধু একজন মানুষের দাসত্ব থেকে পালানোর গল্প নয়—এটি স্বাধীনতা অর্জনের পর সেই স্বাধীনতাকে অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক অসাধারণ ইতিহাস।

হ্যারিয়েট টাবম্যানের জন্মনাম ছিল আরামিন্টা রস। তিনি মেরিল্যান্ডের ডরচেস্টার কাউন্টিতে দাসত্বের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সঠিক জন্মতারিখ নিশ্চিত নয়; অধিকাংশ ঐতিহাসিক গবেষণায় তাঁর জন্ম ১৮২২ সালের কাছাকাছি বলে ধরা হয়। তাঁর মা হ্যারিয়েট “রিট” গ্রিন এবং বাবা বেন রস—দুজনেই দাসত্বের শিকার ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই আরামিন্টা বুঝেছিলেন, দাস হিসেবে জন্ম নেওয়া মানে নিজের শরীর, শ্রম, পরিবার এমনকি ভবিষ্যতের ওপরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকা।

শৈশব থেকেই তাঁকে বিভিন্ন কঠিন কাজে পাঠানো হতো। কখনো শিশুর দেখাশোনা, কখনো ফাঁদ পরীক্ষা, আবার কখনো কৃষিকাজ করতে হয়েছে। সামান্য ভুলের জন্যও মারধর ছিল সাধারণ ঘটনা। দাসপ্রথার নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে স্থায়ী চিহ্নটি তাঁর শরীরে থেকে যায় কৈশোরের এক ঘটনায়।

একজন তত্ত্বাবধায়ক পালিয়ে যাওয়া আরেক দাস ব্যক্তিকে থামানোর চেষ্টা করছিলেন। টাবম্যান সেই ব্যক্তিকে আটকাতে সাহায্য করেননি। তত্ত্বাবধায়ক একটি ভারী ধাতব ওজন ছুড়ে মারলে সেটি টাবম্যানের মাথায় আঘাত করে। তিনি গুরুতর আহত হন। যথাযথ চিকিৎসা ছাড়াই তাঁকে আবার কাজে ফিরতে হয়েছিল। এই আঘাতের পর সারা জীবন তিনি মাথাব্যথা, হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়া এবং ঘুমসংক্রান্ত গুরুতর সমস্যায় ভুগেছিলেন।

এই শারীরিক দুর্বলতা তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং তাঁর গভীর ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে অসুস্থতার সময় দেখা স্বপ্ন ও দর্শন একাকার হয়ে যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন ঈশ্বর তাঁকে পথ দেখাচ্ছেন। পরবর্তী জীবনে সবচেয়ে বিপজ্জনক সিদ্ধান্তগুলোর সময়ও এই বিশ্বাস তাঁকে অসাধারণ মানসিক শক্তি দিয়েছিল।

প্রায় ১৮৪৪ সালে তিনি জন টাবম্যান নামে একজন স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষকে বিয়ে করেন। এই সময় থেকেই তিনি মায়ের নাম অনুসারে নিজের নাম হ্যারিয়েট ব্যবহার করতে শুরু করেন। কিন্তু বিয়ে তাঁকে স্বাধীন করেনি। কারণ সেই সময়ের আইনে একজন দাস নারী কোনো স্বাধীন পুরুষকে বিয়ে করলেও নিজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীন হয়ে যেতেন না।

১৮৪৯ সালে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তাঁর মালিকের মৃত্যুর পর পরিবারটির দাস মানুষদের বিক্রি করে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিক্রি হয়ে গেলে তাঁকে হয়তো আরও দক্ষিণের কোনো রাজ্যে পাঠানো হতো এবং পরিবার থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। টাবম্যান সিদ্ধান্ত নেন—তাঁকে পালাতেই হবে।

প্রথমে তিনি দুই ভাইয়ের সঙ্গে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ভাইদের ভয়ের কারণে তাঁরা ফিরে আসেন এবং টাবম্যানও তাঁদের সঙ্গে ফেরেন। কিছুদিন পর তিনি আবার চেষ্টা করেন—এবার একা।

১৮৪৯ সালের সেই যাত্রার সুনির্দিষ্ট প্রতিটি পথ আজ জানা সম্ভব নয়। তবে তিনি মেরিল্যান্ড থেকে উত্তর দিকে গোপন পথ, নিরাপদ আশ্রয় এবং দাসপ্রথাবিরোধী সহায়তাকারীদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে পেনসিলভানিয়ায় পৌঁছান। পেনসিলভানিয়া তখন একটি মুক্ত রাজ্য ছিল।

স্বাধীন ভূমিতে পৌঁছানোর অনুভূতি পরবর্তীকালে তাঁর স্মৃতিচারণে গভীর আবেগ নিয়ে উঠে আসে। কিন্তু নিজের স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি দ্রুত উপলব্ধি করেন—তাঁর পরিবার এবং পরিচিত মানুষদের অনেকেই এখনো দাসত্বের মধ্যে রয়েছে। তিনি স্বাধীন হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর কাছে স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ ছিল যতক্ষণ প্রিয়জনেরা শৃঙ্খলে বন্দী।

এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে কিংবদন্তিতুল্য অধ্যায়—আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডে তাঁর ভূমিকা। নামটি শুনে এটি কোনো প্রকৃত ভূগর্ভস্থ রেলপথ মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে এটি ছিল গোপন পথ, নিরাপদ বাড়ি, দাসপ্রথাবিরোধী কর্মী, স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায় এবং সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের একটি বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্ক। এর সাহায্যে পালিয়ে যাওয়া দাস মানুষেরা উত্তরাঞ্চলের মুক্ত রাজ্য অথবা কানাডায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতেন।

টাবম্যান এই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বিখ্যাত পথপ্রদর্শকদের একজন হয়ে ওঠেন। পরবর্তী প্রায় এক দশকে তিনি বারবার মেরিল্যান্ডে ফিরে যান। রাতের অন্ধকার, বন, জলাভূমি এবং তুলনামূলকভাবে গোপন পথ ব্যবহার করতেন। নক্ষত্র দেখে দিক নির্ধারণ, স্থানীয় ভূগোল সম্পর্কে জ্ঞান এবং বিশ্বস্ত যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে তিনি মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যেতেন।

তাঁর উদ্ধার অভিযানের সংখ্যা নিয়ে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে অনেক অতিরঞ্জন রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়েছে যে তিনি নিজে আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডের মাধ্যমে শত শত দাস মানুষকে নিয়ে পালিয়েছিলেন। আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণায় বরং ধারণা করা হয়, টাবম্যান প্রায় ১৩টি উদ্ধার অভিযানে আনুমানিক ৭০ জন মানুষকে সরাসরি দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পথ দেখিয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে তাঁর পরিবারের সদস্য ও পরিচিতরাও ছিলেন। এছাড়া তাঁর নির্দেশনা ও যোগাযোগের মাধ্যমে আরও অনেকে স্বাধীনতার পথ খুঁজে পান।

সংখ্যাটি কিংবদন্তির তুলনায় ছোট মনে হলেও বাস্তবতার বিচারে এটি অসাধারণ। প্রতিবার দক্ষিণে ফিরে যাওয়া মানে ছিল গ্রেপ্তার, নির্যাতন অথবা পুনরায় দাসত্বে বিক্রি হওয়ার ঝুঁকি। তাঁকে ধরার চেষ্টা চলছিল এবং দাস পালাতে সাহায্য করা নিজেই গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো।

১৮৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাশ হওয়া ফিউজিটিভ স্লেভ অ্যাক্ট পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করে তোলে। এই আইনের ফলে মুক্ত রাজ্যেও পালিয়ে আসা দাস ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ছিল না। তাদের আটক করে আগের মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল এবং দাস ধরার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে নাগরিক ও কর্তৃপক্ষের ওপরও চাপ ছিল।

ফলে টাবম্যানের অনেক অভিযানের গন্তব্য আরও উত্তরে কানাডা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তিনি অন্টারিওর সেন্ট ক্যাথারিনসে কিছু সময় বসবাস করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত অতিক্রম করাই আর যথেষ্ট ছিল না; প্রকৃত নিরাপত্তার জন্য অনেক পালিয়ে যাওয়া মানুষকে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত কানাডায় পৌঁছাতে হতো।

টাবম্যানের সাহস ও সাফল্যের কারণে দাসপ্রথাবিরোধী মহলে তিনি “মোজেস” নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন—বাইবেলের সেই মোজেসের সঙ্গে তুলনা করে, যিনি দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তির পথে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ফ্রেডেরিক ডগলাস, জন ব্রাউন এবং অন্যান্য দাসপ্রথাবিরোধী ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করেন।

বিশেষ করে জন ব্রাউনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাউন সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে দাসপ্রথা ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন এবং ১৮৫৯ সালে হার্পার্স ফেরিতে ফেডারেল অস্ত্রাগার দখলের চেষ্টা করেন। টাবম্যান তাঁর উদ্দেশ্যের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং স্থানীয় যোগাযোগ ও সম্ভাব্য সমর্থকদের বিষয়ে সাহায্য করেছিলেন। তবে হার্পার্স ফেরির মূল অভিযানে তিনি উপস্থিত ছিলেন না।

১৮৬১ সালে আমেরিকান গৃহযুদ্ধ শুরু হলে টাবম্যানের সংগ্রাম নতুন রূপ নেয়। এখন দাসপ্রথার বিরুদ্ধে তাঁর ব্যক্তিগত ও গোপন লড়াই বৃহত্তর সামরিক সংঘর্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়। তিনি ইউনিয়ন বাহিনীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন এবং প্রথমদিকে নার্স, রান্নার কাজ ও শরণার্থী দাসদের সহায়তায় যুক্ত ছিলেন।

কিন্তু তাঁর দক্ষতা দ্রুত অন্য কাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বহু বছর গোপনে চলাফেরা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিপজ্জনক অঞ্চলে তথ্য সংগ্রহের অভিজ্ঞতার কারণে তিনি স্কাউট ও গোয়েন্দা কার্যক্রমেও কাজ করেন। বিশেষ করে দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গদের কাছ থেকে কনফেডারেট অবস্থান, নদীপথ এবং স্থলমাইন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে তিনি ভূমিকা রাখেন।

তাঁর যুদ্ধকালীন জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ১৮৬৩ সালের ২ জুন কোম্বাহি নদী অভিযানে। কর্নেল জেমস মন্টগোমারির নেতৃত্বে ইউনিয়নের গানবোটগুলো দক্ষিণ ক্যারোলাইনার কোম্বাহি নদী ধরে কনফেডারেট নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে অভিযান চালায়। টাবম্যানের সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্য এবং স্থানীয় জ্ঞান এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ইউনিয়ন বাহিনী নদীর তীরবর্তী বাগান ও অবকাঠামোতে আঘাত করে এবং সেখানে দাসত্বে আবদ্ধ মানুষদের পালিয়ে আসার সুযোগ দেয়। এই অভিযানে সাত শতাধিক দাস মানুষ মুক্ত হয়েছিলেন। টাবম্যানকে প্রায়ই আমেরিকার ইতিহাসে একটি সশস্ত্র সামরিক অভিযানে নেতৃত্বদানকারী প্রথম নারীদের অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এই ঘটনাই তাঁর নামের সঙ্গে “শত শত মানুষের মুক্তি” কথাটিকে সবচেয়ে বাস্তব ঐতিহাসিক ভিত্তি দেয়। আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডে তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ৭০ জনকে পথ দেখিয়েছিলেন; কিন্তু কোম্বাহি নদী অভিযানে তাঁর অংশগ্রহণ সাত শতাধিক মানুষের মুক্তির সঙ্গে যুক্ত। দুটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখলে তাঁর প্রকৃত অবদান আরও স্পষ্ট হয়।

১৮৬৫ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়। কিন্তু টাবম্যানের সংগ্রাম এখানেই শেষ হয়নি। যুদ্ধশেষে তিনি নিউইয়র্কের অবার্নে বসবাস করতে থাকেন এবং পরিবারের সদস্য ও আর্থিকভাবে অসহায় মানুষদের সহায়তা করেন।

বিস্ময়করভাবে, যুদ্ধের সময় এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার পরও তাঁর প্রাপ্য সরকারি পারিশ্রমিক ও স্বীকৃতি পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে তিনি জাতিগত ও লিঙ্গভিত্তিক উভয় বৈষম্যের মুখোমুখি হন। অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যেও তিনি সমাজসেবামূলক কাজ চালিয়ে যান।

জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তিনি নারীর ভোটাধিকারের আন্দোলনেও সক্রিয় হন। সুসান বি. অ্যান্থনি এবং অন্যান্য ভোটাধিকারকর্মীর সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতার ধারণা শুধু দাসপ্রথা বিলোপে সীমাবদ্ধ ছিল না। যে সমাজে নারীর রাজনৈতিক কণ্ঠ নেই, সেই সমাজেও স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ—এই ধারণার পক্ষে তিনি কথা বলেন।

অবার্নে তিনি বয়স্ক ও অসহায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। জীবনের শেষদিকে নিজেও সেই প্রতিষ্ঠানের সেবার আওতায় ছিলেন। ১৯১৩ সালের ১০ মার্চ, প্রায় নব্বই বছর বয়সে হ্যারিয়েট টাবম্যান নিউইয়র্কের অবার্নে মারা যান।

টাবম্যানকে নিয়ে পরবর্তী সময়ে অসংখ্য কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে। তাঁর মাথার জন্য বিশাল অঙ্কের নির্দিষ্ট পুরস্কার ঘোষণা, শত শত মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডে নিয়ে যাওয়া কিংবা প্রতিটি জনপ্রিয় গল্পের সব বিবরণ ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়। কিন্তু এসব অতিরঞ্জন বাদ দিলেও তাঁর প্রকৃত জীবন এতটাই অসাধারণ যে কিংবদন্তির প্রয়োজন পড়ে না।

একজন দাস নারী, যাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, যিনি গুরুতর মাথার আঘাতের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ভুগতেন এবং যাঁর বিরুদ্ধে একটি সম্পূর্ণ আইনব্যবস্থা কাজ করছিল—তিনি নিজে পালিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেন। তারপর সেই নিরাপত্তা বারবার ত্যাগ করে অন্যদের উদ্ধার করতে ফিরে যান। এরপর গৃহযুদ্ধে গোয়েন্দা ও স্কাউট হিসেবে কাজ করেন এবং একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সাত শতাধিক মানুষের মুক্তিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন।

এই কারণেই হ্যারিয়েট টাবম্যানের গল্প শুধু সাহসের নয়, বরং স্বাধীনতার অর্থ নিয়ে একটি গভীর ঐতিহাসিক শিক্ষা। তাঁর কাছে স্বাধীনতা এমন কিছু ছিল না, যা একবার নিজের জন্য অর্জন করলেই সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়। নিজে মুক্ত হয়ে অন্যের শৃঙ্খলকে উপেক্ষা না করার সিদ্ধান্তই তাঁকে ইতিহাসে অনন্য করে তুলেছে। দাসপ্রথার অন্ধকার থেকে শুরু করে গৃহযুদ্ধ এবং নারী ভোটাধিকারের আন্দোলন পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ জীবন তাই যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতার অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিকে বারবার বাস্তবে রূপ দেওয়ার সংগ্রামের এক শক্তিশালী প্রতীক।


You may also like