বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ৮ : প্রথম সূত্র

পৃষ্ঠা 8 / 25

বিকেলের দিকে সোহান আর মেহরিন আবার বেরোল।
বাড়ি থেকে একটু দূরে, পুরোনো গলির শেষে রমজান কাকার ঘর। অর্ণব আজ যায়নি। সে বলেছে, “একদিনে এতখানি সত্য সবার পক্ষে হজম করা কঠিন।”

সোহান কিছু বলেনি।
মেহরিনও না।
কথাটা মন্দ শোনায়নি, তাই উত্তরও দরকার হয়নি।

রমজান কাকার বাড়ির দরজা অর্ধেক খোলা ছিল।
তিনি যখন বেরিয়ে এলেন, হাতে একটা পুরোনো চশমা। চশমাটা চোখে দেননি। খুঁজছিলেন। সোহান সেটা লক্ষ্য করল। এমন লোকদের দেখা যায় যারা কিছু বলার আগে হাত দিয়ে চারপাশটা খুঁজে নেয়।

“কাদেরের ছেলেমানুষ?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

সোহান মাথা নাড়ল। “জি।”

রমজান কাকা একটু দাঁড়ালেন।
তারপর বললেন, “আয়।”

ঘরের ভেতরে ঢুকতেই কেমন এক পুরোনো ভিজে গন্ধ।
চুলার পাশে একটা কেটলি, টেবিলের ওপর খবরের কাগজ, আর দেয়ালে ঝুলছে ফ্যাকাশে একটা ক্যালেন্ডার। রমজান কাকা চেয়ারে বসে প্রথমে চশমা চোখে দিলেন, তারপর সোজা তাকালেন।

মেহরিন বলল, “আমরা একটা ছবি পেয়েছি।”

রমজান কাকা চুপ করে রইলেন।
সোহান ছবিটা বের করে সামনে রাখল।
আব্দুল কাদের সাহেবের পাশে সাদা শাড়ির নারী।

রমজান কাকার চোখ ছবির ওপর গিয়ে স্থির হলো।
তিনি ছবিটা হাতে নিলেন না। শুধু দেখলেন।

“চেনেন?” সোহান জিজ্ঞেস করল।

রমজান কাকা একটু সময় নিলেন।
তারপর বললেন, “মনে আছে।”

মেহরিন চাইল আরও কিছু বলুক। কিন্তু তিনি বললেন না।

সোহান বলল, “তাঁর নামটা—”

রমজান কাকা হাত তুলে থামালেন।
“আগে ওকে দেখতাম। তোমার আব্বা তখন বদলে গেছিল।”

মেহরিন প্রশ্ন করল, “কেমন বদলে?”

রমজান কাকা একটু মাথা কাত করলেন।
“আরও চুপ।”

এই এক লাইনেই যেন অনেক কিছু বলা হয়ে গেল।

সোহান ছবিটার পেছনের লেখা দেখাল না। সে শুধু বলল, “ওনার সঙ্গে বাবার সম্পর্ক কী ছিল?”

রমজান কাকা ধীরে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।
“সম্পর্ক?” তিনি পুনরাবৃত্তি করলেন।
“ওর সঙ্গে তোমার আব্বা খুব ঘুরত না। কিন্তু কিছু মানুষ থাকে, যারা ঘুরে না—থাকে।”

মেহরিন চুপ করে রইল।
এই ধরনের উত্তর সে পছন্দ করল না। কিন্তু তবু শুনল।

সোহান আবার বলল, “নামটা জানেন?”

রমজান কাকা এবার একটু নিচু গলায় বললেন, “সুবর্ণা।”

নামটা বলে তিনি আর কিছু বাড়ালেন না।
যেন এতটুকুই যথেষ্ট।

মেহরিন ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
“সুবর্ণা,” সে ধীরে উচ্চারণ করল।

রমজান কাকা জানালার বাইরে তাকালেন।
“বেশি কিছু জিজ্ঞেস কোরো না।”

সোহান বলল, “কেন?”

রমজান কাকা কেবল কাঁধ নাড়লেন।
“মনে নেই।”

কথাটা বিশ্বাসযোগ্যও লাগল, আবার পুরোপুরি না-ও লাগতে পারত।
কিন্তু এই গলিতে এমন মানুষরা প্রশ্নের উত্তর কম দেয়, থামতে বেশি জানে।

মেহরিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “বাবা ওনাকে নিয়ে বদলে গিয়েছিলেন?”

রমজান কাকা ছবির দিকে না তাকিয়েই বললেন, “হ্যাঁ।”

“কীভাবে?”

তিনি একটু থামলেন।
“আগের মতো কথা বলত না।”

সোহানের চোখ মৃদু নড়ল।
এই উত্তরটা যেন ছবির চেয়েও বেশি ভারী।

রমজান কাকা ধীরে উঠলেন।
“আর কিছু জানলে আমি বলতাম। কিন্তু বেশি কিছু জানি না।”

মেহরিন বলল, “তাহলে আমরা এখন কী করব?”

রমজান কাকা একটু হেসে ফেললেন।
হাসিটা খুব ছোট, খুব ক্লান্ত।
“তোমাদের আব্বা যেটা রাখছে, সেটা একা খুঁজতে গেলে ধীরে যেতে হবে।”

সোহান ছবিটা আবার তুলে নিল।
পেছনের লেখাটা দেখল—
যদি তাকে খুঁজতে যাও, খুব সাবধানে যেও।

মেহরিন সেই বাক্যের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, সাবধানটা ছবির জন্য না।
যার জন্যই হোক, তার চারপাশে এখন একটা বাড়তি অন্ধকার আছে।

বেরিয়ে আসার সময় রমজান কাকা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “একটা কথা।”

সোহান ফিরে তাকাল। “জি?”

“তোমাদের আব্বা শেষ দিকে পুরোনো বাজারের দিকে যেত,” তিনি বললেন।

“কেন?” মেহরিন জিজ্ঞেস করল।

রমজান কাকা মাথা নাড়লেন।
“জানি না।”

এইবার তাঁর ‘জানি না’টা সত্যি মনে হলো।
আর সেটাই হয়তো বেশি জরুরি।

সোহান আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
মেহরিনও না।

তারা বেরিয়ে আসার পর গলিতে কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটল।
মেহরিন হঠাৎ বলল, “নামটা আগে কখনো শুনিনি।”

সোহান বলল, “এখন শুনলি।”

“এখন শুনে মনে হচ্ছে আগে থেকেই শুনেছি,” মেহরিন বলল।

এই কথার পর দুজনের কেউই আর কথা বলল না।
কারণ উত্তর পাওয়া যায়নি, তবু একটা দরজা খুলে গেছে।

রাতে বাড়িতে ফিরে তারা ছবিটা টেবিলে রাখল।
করিম চাচা একবার দেখে শুধু বললেন, “এই নামটা আবার?”

সোহান তাঁর দিকে তাকাল। “আর কোথায় শুনেছেন?”

করিম চাচা মাথা নাড়লেন।
“মনে নাই।”

এই উত্তরটা সবাই নিল।
এই বাড়িতে ‘মনে নাই’ কখনো কখনো একধরনের দেওয়াল হয়ে দাঁড়ায়।

মেহরিন জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা তাকে নিয়ে বদলে গিয়েছিলেন।”

সোহান কিছু বলল না।
শুধু ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

সাদা শাড়ির নারী।
অস্পষ্ট মুখ।
আর পেছনে সাবধানবাণী।

এখন অন্তত একটি নাম আছে।
আর সেই নামের পাশে প্রশ্নও আছে।