বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ৬ : হাসির আড়ালের মানুষ

পৃষ্ঠা 6 / 25

খাম নম্বর ৬ খুলেছিল অর্ণব নিজেই।

সে এমন ভঙ্গিতে খামটা হাতে নিল, যেন এটা খুব সাধারণ কিছু। যেন কাগজের ভেতরে তার নাম থাকলেও তাতে বিশেষ কিছু বদলাবে না। সোহান কিছু বলল না। মেহরিন চুপচাপ তাকিয়ে ছিল। তৃতীয় তলার ঘরের জানালার পাশে বিকেলের আলো তখন আর নেই, কেবল ফ্যাকাসে একরকম সন্ধ্যা।

অর্ণব খামের সিল ভাঙল।
ভেতর থেকে বের হলো একটি ভাঁজ করা কাগজ, আর একটি ছোট সাদা রসিদ।

রসিদটা প্রথমে সোহানের চোখে পড়ল।
তাতে ব্যাংকের নাম।
নিচে টাকার অঙ্ক।

অর্ণব সেটা খুব দ্রুত উল্টে দিল।

“বাহ,” সে বলল, “বাবা তো দেখি আমার হিসাবরক্ষকও ছিলেন।”

মেহরিন বলল, “পড়।”

অর্ণব কাগজটা খুলল।
কাগজে আব্দুল কাদের সাহেবের হাতের লেখা।

সে পড়তে শুরু করল, কিন্তু প্রথম দু-লাইন পরেই তার গলার স্বর বদলে গেল।

“অর্ণব,
তুই সবসময় এমনভাবে হাসিস, যেন তোর জীবনে কোনো দুশ্চিন্তা নেই।
ছোটবেলায়ও তাই করতিস।
হাত কেটে রক্ত পড়লেও আগে হাসতি, পরে ব্যথা পেতি।”

অর্ণব থামল।
হাসলও।
“মন্দ বলেননি বুড়ো মানুষটা।”

কেউ জবাব দিল না।

সে আবার পড়ল।

“মানুষের সামনে যে ছেলেটা সবচেয়ে সহজ থাকে, তাকে বোঝা সবচেয়ে কঠিন।
কারণ সে নিজের কষ্টও মজার কথার ভেতরে লুকিয়ে রাখতে শেখে।”

অর্ণব এবার আর হাসল না।

ঘরের মধ্যে নীরবতা একটু ভারী হলো।

সে নিচের দিকে পড়ল—

“তোর অফিসে আমি গিয়েছিলাম একদিন।
তুই ছিলি না।
বাইরে সাইনবোর্ডে এখনো আগের নামটা ঝুলছে।
ভেতরে দুইটা চেয়ার, একটা টেবিল, আর অগোছালো কাগজ।
যে ছেলে এত গুছিয়ে জামা পরত, তার টেবিল এত অগোছালো কেন—এই প্রশ্নটা আমি সেদিন করিনি।”

অর্ণবের আঙুল কাগজের কোণায় শক্ত হয়ে উঠল।

মেহরিন ধীরে বলল, “বাবা তোমার অফিসে গিয়েছিল?”

অর্ণব কোনো উত্তর দিল না।

সে পড়তে থাকল।

“আমি পরে জেনেছি, তুই ঋণ করেছিস।
এটাও জেনেছি, ঋণের টাকার চেয়ে তোর লজ্জা বড় হয়ে গেছে।
মানুষ টাকার জন্য যতটা ডোবে, লজ্জার জন্য ডোবে তার চেয়ে বেশি।”

অর্ণব হঠাৎ কাগজটা নামিয়ে ফেলল।

“ব্যস,” সে বলল। “অনেক হয়েছে।”

সোহান বলল, “বাকি আছে।”

“থাক,” অর্ণব ঠান্ডা স্বরে বলল। “সব পড়তে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই।”

মেহরিন এবার প্রথমবারের মতো তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “খাম খুলেছিস যখন, পড়।”

অর্ণব তার দিকে তাকাল।
চোখে বিরক্তি নেই। ক্লান্তি আছে।

সে আবার কাগজটা তুলল।

“তুই আমাকে কখনো কিছু বলিসনি।
আমি তোকে জিজ্ঞেসও করিনি।
এটা আমার ভুল।
বাবারা অনেক সময় মনে করে, ছেলে বড় হয়ে গেলে তাকে আর জিজ্ঞেস করতে হয় না।
আসলে তখনই সবচেয়ে বেশি করতে হয়।”

সোহান নিঃশব্দে বসে রইল।
মেহরিন এবার চোখ নামিয়ে নিল।

অর্ণব পড়ল—

“তুই যে টাকাটা ধার নিয়েছিলি, তার প্রথম কিস্তিটা আমি পরিশোধ করেছি।
এটা তোর অপমানের জন্য করিনি।
করেছি, কারণ ডুবে যাওয়া মানুষকে তীরে তোলার আগে সাঁতার শেখানো যায় না।”

এইবার অর্ণবের মুখের রং বদলে গেল।

সে এক ঝটকায় সেই সাদা রসিদটা তুলে নিল।
হাত কাঁপছিল না, কিন্তু আঙুল শক্ত হয়ে ছিল।

সোহান বলল, “বাবা টাকা দিয়েছিলেন?”

অর্ণব খুব নিচু গলায় বলল, “আমি জানতাম না।”

তারপর যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলল, “না… জানার কথা না।”

মেহরিন রসিদের দিকে তাকিয়ে বলল, “কত?”

অর্ণব রসিদটা ভাঁজ করে ফেলল। “ওটা জরুরি না।”

“জরুরি,” মেহরিন বলল।

অর্ণব এবার একটু হেসে উঠল।
সেই পুরোনো ভঙ্গি।
হালকা, নির্লিপ্ত, একটু বিদ্রূপমেশানো।

“তোর সবকিছুই জরুরি লাগে, মেহরিন।”

“আর তোর কিছুই লাগে না—এটাই সমস্যা,” মেহরিন বলল।

ঘরের ভেতর বাতাস কেমন টানটান হয়ে গেল।

সোহান বলল, “ঝগড়া করিস না। পড়া শেষ কর।”

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর শেষ অংশটা পড়ল।

“অর্ণব,
ব্যর্থতা লুকিয়ে রাখলে তা ছোট হয় না।
বরং মানুষের ভেতরে একটা আলাদা ঘর বানিয়ে ফেলে।
সেই ঘরে আলো ঢোকে না।
তুই যদি কোনোদিন মনে করিস, সব শেষ—তাহলে মনে করিস, শেষ আর লজ্জা এক জিনিস না।
শেষ থেকে মানুষ ফিরে আসে।
লজ্জা থেকে অনেকেই আসে না।”

এখানে এসে অর্ণব থামল।

নিচে আরেকটি লাইন ছিল।

“তুই যদি চাস, টেবিলের ডানপাশের ড্রয়ারে রাখা নীল ফাইলটা দেখিস।
সেখানে বাকি হিসাব আছে।”

অর্ণব আর পড়ল না।

সে কাগজটা ভাঁজ করল না।
শুধু চেয়ে রইল।

মেহরিন ধীরে জিজ্ঞেস করল, “নীল ফাইল?”

করিম চাচা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “এই ঘরের টেবিলের ড্রয়ারে একটা ফাইল আছে।”

সবাই তাঁর দিকে তাকাল।

তিনি একটু অস্বস্তি নিয়ে বললেন, “আমি খুলি নাই। শুধু দেখছি।”

অর্ণব ধীরে টেবিলের দিকে গেল।

টেবিলটা দেয়ালের পাশে। ওপরের বইগুলো সরাতেই ডানদিকের ড্রয়ারের হাতল দেখা গেল। সে ড্রয়ার খুলল। ভেতরে সত্যিই একটি নীল ফাইল।

ফাইলটা বের করতেই ধুলো উঠল না।
মানে, সেটা খুব পুরোনো না।
অথবা কেউ শেষ দিকে ছুঁয়েছে।

অর্ণব ফাইল খুলল না।
হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

সোহান এবার প্রথমবারের মতো নরম গলায় বলল, “তোকে বললে কী হতো?”

অর্ণব হেসে ফেলল।
একটা ছোট, শুকনো হাসি।

“কিছু না। আমি তো খুব ভালো ছিলাম, না?”

মেহরিন কিছু বলতে গিয়েও বলল না।

অর্ণব নীল ফাইলটা বগলের নিচে চেপে ধরল।
তারপর জানালার দিকে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তখন আলো প্রায় শেষ। জবা গাছ দেখা যায় না, শুধু তার অন্ধকার ছায়া।

সে খুব আস্তে বলল, “বুঝিস, মানুষ যখন ডুবতে থাকে, তখন সবচেয়ে বড় কষ্ট টাকা না।”

সোহান তাকিয়ে রইল।

অর্ণব বলল, “সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো—একসময় সে নিজেকেও বোঝাতে শুরু করে যে সে ডুবছে না।”

কথাটা বলেই সে চুপ করে গেল।

কেউ তাকে সান্ত্বনা দিল না।
কেউ এগিয়েও গেল না।
এই প্রথম, হয়তো, অর্ণবের হাসির আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখা যাচ্ছিল।

তার হাতে নীল ফাইল।
টেবিলের ওপর খোলা কাগজ।
আর পাশে ব্যাংকের রসিদ।

মেহরিন ধীরে কাগজটা তুলে ভাঁজ করে রাখল।
সোহান চেয়ারে বসে রইল।

অর্ণব জানালার সামনে দাঁড়িয়েই বলল, “ফাইলটা আমি পরে দেখব।”

কেউ আপত্তি করল না।

ঘরের ভেতর তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে।
আর তৃতীয় তলার সেই বন্ধ ঘরে প্রথমবারের মতো অর্ণবের হাসিটা একটু কম শোনা গেল।