বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ২৫ : চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

পৃষ্ঠা 25 / 25

কয়েক মাস কেটে গেছে।

কাদের সাহেবের পুরোনো বাড়িটা এখন আর আগের মতো নেই।
ভেতরের দেয়ালগুলো রং করা হয়েছে।
ছাদে জমে থাকা ফাটলগুলো মেরামত হয়েছে।
আর যেখানে একসময় কেবল নীরবতা থাকত, সেখানে এখন বইয়ের গন্ধ।

বাড়িটা এখন লাইব্রেরি।

দরজার সামনে একটা জবা গাছ লাগানো হয়েছে।
এখনো খুব বড় হয়নি।
পাতাগুলো নতুন, লাল ফুলগুলো একটু দূর থেকেই চোখে পড়ে।
যেন বাড়িটা নিজেই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—পুরোনো জায়গাও আবার বাঁচতে শেখে।

জানালার পাশে কাদের সাহেবের পুরোনো কাঠের চেয়ারটা রাখা আছে।
সেই চেয়ারটা আর ব্যবহার করা হয় না।
শুধু রাখা আছে।
যেন কেউ এলে বুঝতে পারে, এখানে আগে একজন মানুষ বসত, যে খুব বেশি কথা বলত না।

কাদের সাহেবের চশমাটা একটা ছোট কাচের বাক্সে রাখা।
তার পাশে তার কলম।
আর আলমারির নিচের তাকে রাখা আছে তিনটি খালি খাম।
কেউ চাইলেই দেখতে পারে।
কেউ চাইলেই বুঝতে পারে—এই বাড়িতে একসময় কতগুলো না-বলা গল্প ছিল।

সোহান একদিন বলেছিল, জিনিসগুলো ফেলে না দিয়ে রেখে দেওয়াই ভালো।
মেহরিন সেটা মেনে নিয়েছিল।
অর্ণব কিছু বলেনি।
শুধু চুপচাপ তাকিয়ে ছিল, তারপর জানালার দিকে ফিরে গিয়েছিল।

এখন পাড়ার বাচ্চারা বিকেলের পর এখানে আসে।
কেউ গল্পের বই পড়ে।
কেউ বানান শেখে।
কেউ আবার জানালার পাশে বসে চুপ করে তাকিয়ে থাকে।
লাইব্রেরির ভেতরে এখন শব্দ আছে, কিন্তু সেই শব্দ কোলাহল নয়।
এটা জীবনের শব্দ।

সেই শব্দের মধ্যে এখন আর ভয়ের কিছু নেই।
কারণ কেউ জানে না ঠিক, এই বাড়িটায় একসময় কতগুলো না-বলা গল্প ছিল।
তবু গল্পগুলো বেঁচে আছে।
বইয়ের পাতায়, চেয়ারের কাঠে, জবা গাছের ছায়ায়।

সোহান, মেহরিন আর অর্ণব প্রায়ই এখানে আসে।
কখনো একসঙ্গে।
কখনো আলাদা।
তাদের মধ্যে আগের মতো একই প্রশ্ন নেই।
কিন্তু নীরবতায় এখন আর ভার নেই।
ওই নীরবতা পরিচিত।

সেদিন সন্ধ্যায় তিনজন আবার পাশাপাশি বসেছিল।
জানালার বাইরে চাঁদ উঠছে।
লাইব্রেরির দেয়ালে তার আলো পড়েছে।
জবা গাছের পাতাগুলো সাদা হয়ে আছে সেই আলোয়।

কেউ কিছু বলছে না।

মেহরিন চা’র কাপটা হাতে নিয়ে বাইরে তাকাল।
অর্ণব একটা বইয়ের পাতা উল্টে থামল।
সোহান চশমার বাক্সটার দিকে তাকিয়ে রইল।

এই বাড়িতে একসময় যেসব কথা বলা যায়নি, সেগুলো এখন আর ঘরটাকে ভারী করে না।
সেগুলো থেকে গেছে দেয়ালের ভাঁজে, জানালার পাশে, পুরোনো চেয়ারের কাঠে।
আর আজ, এতদিন পরে, সেখানেই তাদের শান্তি।  

বাইরে চাঁদের আলো ধীরে ধীরে উঠোনের ওপর পড়ে।
জবা গাছটা হালকা দুলছে।
কোথাও দূরে একটা ট্রেন যাওয়ার শব্দ শোনা যায়।
তারপর আবার নিস্তব্ধতা।

সোহান শেষবার লাইব্রেরির ভেতরটা দেখল।
বইয়ের তাক।
ছোট চেয়ার।
জানালার ধারে আলো।
আর তিনজন মানুষ, যারা এতদিন পরে এসে বুঝেছে—সব সত্য শেষ হয় না বলেই কিছু জায়গা বেঁচে থাকে।

মানুষ চলে যায়।
গল্পও একদিন শেষ হয়।
তবু কিছু বাড়ি থেকে যায়—চাঁদের আলোয়, নীরবে।
আর সেই বাড়িগুলোর মধ্যে সবসময় একটা থাকে—তৃতীয় বাড়ি।

হয়তো প্রতিটি মানুষের জীবনেই কোথাও না কোথাও একটা তৃতীয় বাড়ি থাকে। 
যেখানে মানুষ নয়, অপেক্ষা করে স্মৃতিরা। 

 

*** শেষ ***