চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি
অধ্যায় ২৩ : শেষ সত্য
পরদিন সকালে তারা আবার চন্দনপুরে গেল।
স্টেশনের পিছনের পুরোনো ঘরটায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে রোদ উঠেছে।
এইবার খাতাটা খোলা ছিল না।
টেবিলের ওপরও কিছু পড়ে ছিল না।
শুধু সেই পুরোনো ঘর, ধুলো, আর ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া আলো।
সোহান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, এখানে আজও এমন কিছু আছে, যা আগের দিন চোখে পড়েনি।
মেহরিন টেবিলের নিচের খোপটার দিকে তাকাল।
“ওখানে কিছু আছে?”
অর্ণব ঝুঁকে দেখল।
খোপটা পুরোনো কাঠের তৈরি, সামান্য ঢিলা।
কোনো একসময় হয়তো জিনিস রাখার জন্য বানানো হয়েছিল।
সোহান হাত ঢোকাতেই আঙুলে কাগজ ছুঁয়ে গেল।
একটা খাম নয়।
একটা ভাঁজ করা কাগজ।
বের করে খুলতেই প্রথম লাইন পড়ে ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“আমি রাশেদ।”
মেহরিন চুপ করে গেল।
অর্ণব কাগজটার দিকে এগিয়ে এল।
চিঠিটা ছোট ছিল না।
কিন্তু ভারী ছিল।
একটা মানুষ কতদিন ধরে না-বলা কথা বুকে বহন করলে কাগজও এমন ভারী হয়ে ওঠে, সেটা তিনজন তখন বুঝতে পারছিল।
রাশেদ লিখেছিল, দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক দিন সে কিছুই ঠিকমতো মনে করতে পারেনি।
না নিজের নাম, না বাড়ি, না কারও মুখ।
শুধু শব্দের টুকরো।
জানালার কাচে নিজের অস্পষ্ট মুখ।
নার্সদের গলা।
আর এক ধরনের ভয়, যা সে ভাষায় বলতে পারছিল না।
সে লিখেছিল, প্রথম যেদিন নিজের নাম মনে পড়ে, সে আনন্দ পায়নি।
সে ভয় পেয়েছিল।
কারণ নাম ফিরে এলে শুধু অতীত ফেরে না, দায়ও ফেরে।
“আমি তখন বুঝেছিলাম,” সে লিখেছিল,
“ফিরে যাওয়া মানে শুধু ঘরে ফেরা নয়।
ফিরে গেলে অনেক কিছুকে আবার ভেঙে দেখতে হয়।”
সোহান ধীরে পড়ছিল।
চিঠিতে আরও ছিল, রাশেদ ধীরে ধীরে বুঝতে পারে—সে নতুন পরিচয়ে বেঁচে আছে।
কেউ তাকে অন্য নামে ডাকছে।
কেউ তার অতীত জুড়ে দিচ্ছে না।
এবং সেই নতুন জীবনের ভেতর সে কখনও কখনও এমনভাবে থাকত, যেন নিজের অস্তিত্বের পাশে দাঁড়িয়ে আছে শুধু।
এক জায়গায় লেখা ছিল—
“হাসপাতালের জানালায় নিজের মুখ দেখে আমার প্রথম মনে হয়েছিল, মানুষটা আমি না।”
মেহরিন খুব আস্তে নিঃশ্বাস ফেলল।
রাশেদ লিখেছিল, পরে একদিন বাইরে থেকে একজন এসেছিল।
সে লিখেছে, “একজন পুরোনো মানুষ।”
নামটি তখনও দেয়নি।
শুধু বলেছিল, সে অনেকক্ষণ বসে ছিল।
তাকে দেখে প্রথমে কিছুই মনে হয়নি।
তারপর একটু একটু করে মনে পড়েছে।
সোহান পড়ল সেই অংশ—
“সে এসে বসেছিল।
বেশিক্ষণ কিছু বলেনি।
আমি তাও চিনতে পারিনি প্রথমে।
কিন্তু তার চোখে এমন কিছু ছিল, যা ভুলে থাকা যায় না।
আমার নাম সে বলেনি।
শুধু আমার পাশে বসেছিল।”
মেহরিন জানালার দিকে তাকাল।
বাইরে আলো বদলাচ্ছে।
চিঠিতে এরপর রাশেদ সুবর্ণার কথা লিখেছিল।
সে লিখেছিল, কাদের তাকে খুঁজে পেয়ে একবার জানিয়ে দেয়—সুবর্ণা এখনো অপেক্ষা করছে।
কিন্তু রাশেদ তখনও ফিরে আসেনি।
কারণ সে জানত, একবার ফিরে গেলে পুরোনো জীবনের সব অসহ্য প্রশ্ন আবার উঠবে।
সে সুবর্ণাকে শেষবার দেখেছিল স্টেশনের ধারে।
“সে কাঁদেনি,” রাশেদ লিখেছিল।
“শুধু তাকিয়ে ছিল।
তারপর বলেছিল, যদি ফিরতে না পারো, অন্তত ভালো থেকো।”
সেই লাইন পড়ে মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।
রাশেদ লিখেছিল, সে কোনোদিন পুরোপুরি হারায়নি।
সে শুধু দূরে সরে গিয়েছিল।
নতুন নাম, নতুন ঠিকানা, নতুন নীরবতা নিয়ে।
“আমি ফিরে আসিনি,” সে লিখেছিল,
“কারণ ফিরে এলে শুধু আমিই ফিরতাম না।
সবাইকে আবার সেই পুরোনো ক্ষতের মুখে দাঁড় করাতে হত।”
চিঠির শেষভাগে সে আর দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেয়নি।
শুধু লিখেছিল, কাদের সব জানত।
আর জানত বলেই চুপ ছিল।
“কাদেরকে আমি কখনো দোষ দিইনি,”
“কারণ ও জানত—কিছু সত্য বলা মানে মানুষকে বাঁচানো নয়, কখনও কখনও ভেঙে ফেলা।”
চিঠির শেষে আরেকটি ছোট লাইন ছিল—
“আমি যদি আবার কারও জীবনে আসি, সেটা যেন অপরাধ না হয়।”
কাগজটা ভাঁজ করতে সোহানের হাত একটু কেঁপে উঠল।
সে চিঠিটা খাতার ভেতর আগের জায়গাতেই রেখে দিল।
মেহরিন দীর্ঘক্ষণ কিছু বলল না।
অর্ণবও না।
এই চিঠি তাদের জন্য উত্তর দেয়নি সবকিছুর।
কিন্তু রাশেদের কণ্ঠটা এখনো ঘরের মধ্যে রয়ে গেল।
আর সেটাই যথেষ্ট ছিল, কারণ রাশেদ এখন আর শুধু হারিয়ে যাওয়া নাম নয়।
সে একটা মানুষ হয়ে উঠেছে—ভয় নিয়ে, দায় নিয়ে, আর অসম্পূর্ণ ভালোবাসা নিয়ে।
অর্ণব শেষে খুব আস্তে বলল, “তাহলে... এটাই সত্যি?”
সোহান মাথা নাড়ল।
কিন্তু সে জানত, শেষ মানে সব শেষ নয়।
কারও গল্প শেষ হলেও তার রেখে যাওয়া নীরবতা থেকে যায়।
আর সেই নীরবতাই পরের দরজা খুলে দেয়।
সে খাতাটা আর একবার তুলে নিল।
শেষ পাতায় কাদেরের নাম।
আব্দুল কাদের
এবার সেটা আর রহস্য ছিল না।
ছিল একজন মানুষের সই, যার ভেতরে অনেক বছর ধরে একটা অচেনা ভার বসে ছিল।
সোহান খাতাটা ধীরে বন্ধ করল।
বাইরে তখন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে রোদ পড়েছে।
একটা ট্রেন এসে থেমে আবার চলে গেল।
যাত্রীরা উঠল-নামল।
দূরে শব্দ মিলিয়ে গেল।
ঘরের ভেতর তিনজন আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকল না।
যেন তারা বুঝে গেছে, এখানে যা পাওয়ার ছিল, তা পাওয়া গেছে।
এবার ফিরতে হবে।
কারণ এই গল্পের শেষ কণ্ঠস্বর এখনও শোনা বাকি।