চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি
অধ্যায় ১৩ : সুবর্ণার সন্ধানে
সকালের আলো তখনও পুরোপুরি নামেনি।
তৃতীয় তলার ঘরে একটা অদ্ভুত শীতলতা ছিল। টেবিলের ওপর রাশেদের ছবিটা, পাশে খোলা ডায়েরি, আর কিছু পুরোনো কাগজ। ডায়েরির পাতায় যে-নামটা প্রথমবার উঠেছিল, সেটাই এখন সবার কথার কেন্দ্রে।
সুবর্ণা।
মেহরিন ছবিটা সরিয়ে রাখল।
“আজ কোথায় যাবি?” সে জিজ্ঞেস করল।
সোহান ডায়েরির একটা পাতা টেবিলের ওপর রাখল।
“লাইব্রেরি,” সে বলল। “আর কলেজের পুরোনো অংশ। যদি কিছু মেলে।”
অর্ণব চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে বলল, “পুরোনো জায়গা, পুরোনো মানুষ—দুটোই এখন আমাদের ভাগ্যে।”
কেউ হাসল না।
কারণ কথাটার ভেতরে হালকা বিদ্রুপের চেয়ে বেশি সত্য ছিল।
করিম চাচা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “শহরের পুরোনো লাইব্রেরিটা এখনো আছে। কলেজের পাশের গলিতে।”
সোহান তাঁর দিকে তাকাল।
“আপনি জানেন?”
“জানি,” তিনি বললেন। “তোমাদের আব্বা যেত।”
এই উত্তরটাতেই একটা দরজা খুলে গেল বলে মনে হলো।
সোহান কিছু না বলে কাগজগুলো গুছিয়ে নিল।
একজন মানুষ কোথায় যেত, কাকে দেখত, কোন জায়গায় চুপ থাকত—এইসবই তার জীবনের মানচিত্র।
তিনজন শহরের পুরোনো অংশে বেরিয়ে পড়ল।
রাস্তাগুলো এখানে সরু।
দোকানের সাইনবোর্ড ফ্যাকাশে।
দেয়ালে চুন উঠে গিয়ে ইটের রং দেখা যায়।
মানুষের হাঁটায় তাড়া নেই।
জায়গাটা যেন নিজেরই পুরোনো অভ্যাস ধরে রেখেছে।
লাইব্রেরির সামনে একটা ঝাপসা সাইনবোর্ড।
গেটের পাশে ছোট একটা দেয়াল, যার রং অনেক আগেই উঠে গেছে।
ভেতরে ঢুকতেই কাগজের গন্ধ।
ধুলো, কাঠ, আর বহুদিনের নীরবতা।
কাউন্টারের পেছনে একজন বৃদ্ধ বসে ছিলেন।
চশমা পরে আছেন।
কোনো কিছু লিখছিলেন।
তিনজনকে দেখে কলম থামালেন।
“কী চাই?” তাঁর গলায় বিরক্তি নেই, তাড়াও নেই।
শুধু অভ্যস্ত জিজ্ঞাসা।
সোহান একটু এগিয়ে বলল, “একজন নারীর খোঁজে এসেছি। নাম সুবর্ণা।”
বৃদ্ধের কলমটা থেমে গেল।
তিনি মাথা তুলে তাকালেন।
“সুবর্ণা?”
সোহান সেটা দেখল।
নামটা তিনি চেনেন।
মেহরিন নরম গলায় বলল, “আপনি চিনতেন?”
বৃদ্ধ একটু চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “অনেক বছর আগের কথা, বাবা।”
অর্ণব পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
সোহান জিজ্ঞেস করল, “এখানে আসতেন?”
বৃদ্ধ চশমাটা ঠিক করে নিলেন।
“হুঁ।”
“নিয়মিত?” মেহরিনের কণ্ঠে চাপা উৎসাহ।
“আসতেন,” বৃদ্ধ বললেন।
“কিন্তু খুব কথা বলতেন না।”
এইবার আরেকটু সময় নিলেন।
“বই খুব যত্ন করে ধরতেন।”
এই একটা লাইনেই সুবর্ণা একটু এগিয়ে এল।
কেবল নাম না।
একজন মানুষ, যে বই ধরত যত্ন করে।
সোহান জিজ্ঞেস করল, “কী ধরনের বই?”
বৃদ্ধ তাকিয়ে রইলেন তাকের দিকে।
“গল্প, কবিতা, পুরোনো অনুবাদ।
কখনো ইতিহাসও।”
মেহরিন ধীরে বলল, “কাদের সাহেবের জন্য বই রাখা হতো?”
বৃদ্ধ কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়াই বললেন, “হুঁ।”
তারপর একটু থেমে যোগ করলেন, “কাদের সাহেব মাঝেমধ্যে বলে যেতেন, অমুক বইটা তুলে রাখবেন।”
অর্ণব হালকা ভ্রু তুলল।
“তাহলে উনি সত্যিই আসতেন?”
“আসতেন,” বৃদ্ধ বললেন।
“কখনো একা। কখনো...”
তিনি কথা শেষ করলেন না।
একটা পাতার দিকে চোখ গেল তাঁর।
সেখানে লেখা খসড়া কিছু নাম।
সোহান বুকের ভেতর একটু শক্ত অনুভব করল।
কাগজে নাম আছে।
বাড়িতে নাম নেই।
এই পার্থক্যটাই যেন গল্পের ভেতর এখনো জমে আছে।
বৃদ্ধ একটা পাতার দিকটা দেখিয়ে বললেন, “রেজিস্টারে নাম লিখে যেতেন।”
সোহান আগ্রহ নিয়ে পাতাটা কাছে টানল।
একটি লাইনে লেখা—
সুবর্ণা
নিচে তারিখ।
আর বইয়ের নাম।
মেহরিন একটু কাছে এসে তাকাল।
“এখানে কী নম্বর?”
বৃদ্ধ পাতা উল্টে দেখালেন।
“সদস্য নং ১৭।”
অর্ণব ফিসফিস করে বলল, “১৭...”
সোহান নাম, তারিখ, আর সেই নম্বরটাকে চোখে নিয়ে নিল।
একটা ছোট সংখ্যা, তবু ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে—এটা টের পেল।
মেহরিন ধীরে বলল, “তিনি কি একা বসতেন?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“বেশির ভাগ সময়।”
“কোথায়?”
বৃদ্ধ তার পেছনের দিকে, লাইব্রেরির মাঝামাঝি অংশের দিকে ইশারা করলেন।
“ওই টেবিলে।”
সেখানে একটা কাঠের টেবিল ছিল।
জানালার পাশে না।
টেবিলটার ঠিক পাশে একটি নির্দিষ্ট কোণ।
একটা খালি চেয়ার।
সোহান থেমে গেল।
“সবসময় ওই টেবিল?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“হুঁ। একটাই টেবিল।”
এবার চেয়ারের বদলে টেবিল।
একই জায়গা।
একই অভ্যাস।
এটাতে সুবর্ণা আরও বাস্তব লাগল।
অর্ণব টেবিলটার দিকে তাকিয়ে বলল, “কেউ যদি একই জায়গায় বসে, সেটা কি অভ্যাস, না অভ্যাসের চেয়েও বেশি কিছু?”
বৃদ্ধ শুনলেন, কিন্তু উত্তর দিলেন না।
মেহরিন একটু ধীরে বলল, “ওই জায়গায় বসে কী করতেন?”
বৃদ্ধ কাঁধ ঝাঁকালেন।
“পড়তেন।”
“আর?”
“পাতার ভাঁজ ঠিক করতেন।”
সোহান তাঁর দিকে তাকাল।
“মানে?”
“বইটা ফেরত দেওয়ার আগে পাতাগুলো হাত দিয়ে মুছতেন।
ভাঁজ থাকলে ঠিক করতেন।”
এই লাইনটা ঘরের নীরবতার মধ্যে ছোট হয়ে গেল, কিন্তু রেখে দিল একটা মানুষকে।
যত্ন করে বই ধরা।
ফেরত দেওয়ার আগে ভাঁজ ঠিক করা।
মেহরিন বলল, “শেষবার কোন বই নিয়েছিলেন?”
বৃদ্ধ একটু থেমে বললেন, “মনে নেই।”
তারপর নিজেই বললেন, “মনে করতে চাই না।”
এই উত্তরটা আগের “জানি না” থেকে আলাদা।
এখানে এড়িয়ে যাওয়া আছে।
আরও কিছু আছে, যা হয়তো বলা ঠিক নয়।
সোহান কিছু না বলেই আরেকটা বইয়ের রেজিস্টার দেখল।
সুবর্ণার নাম বারবার উঠছে।
কাদের সাহেবের নামও পাশে-পাশে আছে।
বৃদ্ধ হঠাৎ বললেন, “তোমাদের আব্বা বই জমা রাখতে এসে বসতেন এখানে।”
“এই টেবিল?” অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
“হুঁ।”
মেহরিন তাকিয়ে বলল, “ওরা একসঙ্গে আসতেন?”
বৃদ্ধ একটু সময় নিলেন।
তারপর বললেন, “সব সময় না।”
সোহান আস্তে বলল, “ওদের মধ্যে কোনো কথা হতো?”
বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকালেন।
“হতো।”
“কী ধরনের কথা?”
তিনি আবার কলম তুলে নিলেন, যেন উত্তর দিতে না হয়।
তারপর খুব ছোট গলায় বললেন, “বই নিয়ে কথা।”
অর্ণব মুচকি হাসল।
“বই নিয়ে কথা বলাই কি সবচেয়ে নিরাপদ?”
বৃদ্ধ কিছু বললেন না।
সোহান রেজিস্টারের শেষ পাতাগুলো দেখল।
নাম, তারিখ, বই।
সুবর্ণার উপস্থিতি ধীরে ধীরে পাতা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু তার চারপাশে এখনো এমন কিছু আছে, যা পুরোটা খুলে বলছে না।
মেহরিন হঠাৎ বলল, “কলেজেও কি কেউ মনে রাখতে পারে?”
বৃদ্ধ একটু চুপ করে থেকে বললেন, “হয়তো।”
“যাব?” সোহান জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধ জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যান।
কেউ যদি মনে রাখে, সেখানেই বলবে।”
এই কথাটা খুব সরাসরি নয়।
তবু যথেষ্ট।
তিনজন লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এলো।
পিছনে তাকাল না।
কিন্তু জানালার পাশে যে টেবিলটা ছিল, সেখানে সুবর্ণা বসে ছিল না।
তবু মনে হলো কেউ যেন বসে রইল।
বাইরে কলেজের গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মেহরিন বলল, “একটা মানুষ, একটা টেবিল, একটা রেজিস্টার।”
অর্ণব বলল, “আরেকটা নাম।”
সোহান কিছু বলল না।
কারণ এখন সে বুঝছে, সুবর্ণা শুধু নাম নয়।
কাগজে নাম, বইয়ের ভাঁজ, আর পুরোনো শহরের গন্ধের ভেতর দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে উঠছেন।
কলেজের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে তারা আবার লাইব্রেরির দিকটা একবার তাকাল।
দরজা বন্ধ।
ভেতরে অন্ধকার।
সোহান ধীরে বলল, “আজ আমরা খুব বেশি পাইনি।”
মেহরিন একবার হেসে ফেলল, কিন্তু হাসিটা ছোট।
“না।
তবে যা পেয়েছি, সেটা হারানো না।”
অর্ণবের চোখ তখন পুরোনো গেটের ওপর।
সে বলল, “আর বাবার নামও বারবার এসেছে।”
সোহান মাথা নাড়ল।
হ্যাঁ, বাবার নাম।
আর সুবর্ণার নাম।
দুটো নামই একসঙ্গে শহরের পুরোনো দেয়ালে লেগে আছে।
তারা পেছনে ফিরে আর তাকাল না।
তবে মনে হলো, লাইব্রেরির ভেতরের সেই টেবিলটা এখনও কারও জন্য অপেক্ষা করছে।