বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ১০ : রাশেদ

পৃষ্ঠা 10 / 25

ডায়েরির ওই পাতাটা খুলতেই সোহান থেমে গেল।

সকালের আলো তৃতীয় তলার ঘরে পড়ছে। জানালার ধারে ধুলো জমে আছে। খাতাটা তার হাতে। মেহরিন পাশে দাঁড়িয়ে, অর্ণব চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে, আর করিম চাচা দরজার কাছে—চুপ।

সোহান পড়ল।

রাশেদ বলেছিল, চুপ থাকলে একদিন সবাই তোমাকে ভুল বুঝবে।

মেহরিন ধীরে বলল, “রাশেদ কে?”

সোহান আরেক পাতা উল্টাল।
সেখানে লেখা—

আজ রাশেদ প্রথমবার আমাকে ‘কাদের’ বলে ডাকল।

অর্ণব চোখ কুঁচকে বলল, “এবার কিছু হলো।”

সোহান পড়তে থাকল।

রাশেদ বলল, মানুষ কি নিজের প্রিয় মানুষকে অন্যের হাতে তুলে দিতে পারে?
আমি জানতাম, উত্তর দিলে আমাদের দুজনের জীবনই বদলে যাবে। তাই চুপ করে রইলাম।

মেহরিন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
“প্রিয় মানুষ?” সে ফিসফিস করল।

করিম চাচা একপাশে তাকালেন।
কিছু বললেন না।

আরেক পাতা।

মা আজ আবার কাঁদল।
রাশেদ বলল, ছোট হতে হতে একদিন মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়।

অর্ণব মুখ তুলে বলল, “এটা তো—”

সে বাকিটা বলল না।

সোহান পাতাগুলো আরও উল্টাল।
এবার লেখাটা একটু কম।
কিন্তু প্রতিটি লাইন আগের চেয়ে বেশি থেমে থেমে।

রাশেদ আমাকে বলল, কাউকে কিছু দিতে গেলে আগে নিজেকে হারাতে হয়।

আজ রাশেদ প্রথমবার রাগ করল।

রাশেদ বলল, সবাই আমাকে বড় ভেবে ভুল করে।

সোহান থামল।

করিম চাচার মুখ হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল।
খুব সামান্য।
কিন্তু সোহান সেটা দেখল।

সে ডায়েরির শেষ পাতার দিকে গেল।
পাতাটা আগের চেয়ে একটু মোটা লাগল।
ভাঁজ করা কিছু আটকে আছে।

সোহান আঙুল দিয়ে সেটা বের করল।

একটা ছোট ভাঁজ করা কাগজ।
হলুদ, কাঁচা, পুরোনো।

সে কাগজটা খুলল।

ভেতরে বাবার হাতের লেখা।
একটি বাক্য।
সোজা, নির্দিষ্ট, আর হঠাৎ করে ঘরের সব শব্দ থামিয়ে দেওয়ার মতো।

যদি এই ডায়েরি কেউ পড়ো, তবে জেনে রেখো—রাশেদ শুধু আমার জীবনের মানুষ ছিল না। সে এই বাড়িরও মানুষ ছিল। আমার রক্তের মানুষ। তোমরা যাকে কোনোদিন চিনতে পারোনি।

কেউ কথা বলল না।

মেহরিন ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল।
অর্ণবের মুখে কোনো হাসি নেই।
করিম চাচা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে চোখ নামিয়ে ফেললেন।

সোহান কাগজটা ধরে রইল।
এখন ডায়েরির সব পুরোনো লাইন একসঙ্গে অন্য রূপ নিচ্ছে।
রাশেদ আর একজন অচেনা নাম নয়।
তিনি এই বাড়িরই মানুষ ছিলেন।

করিম চাচা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর খুব আস্তে বললেন, “রাশেদ সাহেব... আপনার আব্বার ছোট ভাই ছিলেন।”

তার গলা ভারী ছিল।
সেই ভারে ঘরটাও একটু নিচু হয়ে এলো।

মেহরিন মাথা নিচু করে বলল, “তাহলে এতদিন…?”

করিম চাচা উত্তর দিলেন না।
তারপর খুব আস্তে আরেকটি লাইন যোগ করলেন, “আপনার দাদাজান এই নামটা বাড়িতে বলতে নিষেধ করেছিলেন।”

সোহান আবার ডায়েরির পাতার দিকে তাকাল।
নতুন করে বুঝতে শুরু করল—এই খাতা শুধু স্মৃতি নয়।
এটা একটা মুছে ফেলা ইতিহাসের প্রথম চিহ্ন।

অর্ণব ধীরে বলল, “তাহলে বাবার জীবনের গল্পটা এখনো শুরুই হয়নি।”

কেউ উত্তর দিল না।

সোহান কাগজটা ভাঁজ করল না।
প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—তারা এতদিন বাবার গল্প পড়ছিল।
আজ থেকে শুরু হলো এই বাড়ির ইতিহাস।