গিরগিটি কেন রং বদলায়? শুধু ছদ্মবেশ নয়, এর পেছনে রয়েছে আরও বিস্ময়কর কারণ
- Author: Admin
- August 31, 2026
গিরগিটির রং বদলানোর বিস্ময়কর বিজ্ঞান
গিরগিটি বললেই আমাদের চোখের সামনে এমন একটি প্রাণীর ছবি ভেসে ওঠে, যে মুহূর্তের মধ্যে নিজের শরীরের রং বদলে আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। সবুজ পাতায় উঠলে সবুজ, শুকনো ডালে বসলে বাদামি—এমন ধারণা এতটাই জনপ্রিয় যে গিরগিটির রং পরিবর্তনকে প্রায় পুরোপুরি ছদ্মবেশের কৌশল হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং বিস্ময়কর। গিরগিটি শুধু লুকিয়ে থাকার জন্য রং বদলায় না; তার রং অনেক সময় শরীরের তাপমাত্রা, উত্তেজনা, ভয়, আগ্রাসন, সামাজিক অবস্থান, প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি সতর্কবার্তা এবং সঙ্গী নির্বাচনের সংকেত প্রকাশ করে। অর্থাৎ গিরগিটির শরীর যেন একই সঙ্গে একটি তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং দৃশ্যমান সংকেতপর্দা।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গিরগিটি ইচ্ছেমতো পৃথিবীর যেকোনো রং ধারণ করতে পারে—এ ধারণাটিও সঠিক নয়। একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির গিরগিটি কোন কোন রং এবং কতটা পরিবর্তন করতে পারবে, তা তার ত্বকের গঠন, বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক অবস্থা এবং বংশগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। কিছু প্রজাতির পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে সীমিত, আবার কিছু প্রজাতির পুরুষ সদস্য উত্তেজিত অবস্থায় অত্যন্ত উজ্জ্বল হলুদ, সবুজ, নীলচে, কমলা কিংবা লালচে আভা প্রদর্শন করতে পারে।
গিরগিটির এই ক্ষমতা বোঝার জন্য প্রথমেই তার ত্বককে বুঝতে হয়। বাইরে থেকে ত্বককে সাধারণ রঙিন আবরণ মনে হলেও এর নিচে রয়েছে বিশেষায়িত কোষের বিভিন্ন স্তর। কিছু কোষে হলুদ ও লালচে রঞ্জক থাকে, আবার কিছু বিশেষ কোষের মধ্যে থাকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র স্ফটিকসদৃশ গঠন। আলো এসব গঠনের সঙ্গে ক্রিয়া করে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলিত করতে পারে। ফলে আমাদের চোখে গিরগিটির শরীরের রং বদলে গেছে বলে মনে হয়।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশগুলোর একটি হলো ইরিডোফোর নামের বিশেষ প্রতিফলক কোষ। বাংলায় একে আলো প্রতিফলনকারী বিশেষ ত্বককোষ বলা যেতে পারে। এসব কোষের মধ্যে অতি ক্ষুদ্র গুয়ানিন স্ফটিক থাকে। স্ফটিকগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিবর্তিত হলে কোন ধরনের দৃশ্যমান আলো বেশি প্রতিফলিত হবে, সেটিও বদলে যায়। ফলে ত্বকের দৃশ্যমান রং পরিবর্তিত হতে পারে। অর্থাৎ ঘটনাটি কেবল রঞ্জক পদার্থ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যাওয়ার ব্যাপার নয়; এর সঙ্গে ত্বকের অতি ক্ষুদ্র কাঠামোর ভৌত পরিবর্তন এবং আলোর প্রতিফলনের সম্পর্কও রয়েছে।
সহজভাবে কল্পনা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। পাশাপাশি সাজানো অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র প্রতিফলক যদি খুব কাছাকাছি থাকে, তাহলে তারা নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বেশি প্রতিফলিত করবে। তাদের মধ্যকার দূরত্ব বাড়লে প্রতিফলনের বৈশিষ্ট্যও বদলে যাবে। গিরগিটির ত্বকের বিশেষ কোষে অনেকটা এমন ঘটনাই ঘটে। স্নায়বিক ও শারীরবৃত্তীয় সংকেতের প্রভাবে এসব অণুবীক্ষণিক কাঠামোর বিন্যাস বদলে যেতে পারে এবং তার ফলেই দৃশ্যমান রঙে দ্রুত পরিবর্তন আসে।
তবে সবুজ গিরগিটির সবুজ রং যে সরাসরি সবুজ রঞ্জক থেকেই আসে, ব্যাপারটি এত সরল নয়। ত্বকের হলুদ রঞ্জক এবং নিচের প্রতিফলক স্তর থেকে ফিরে আসা নীলচে আলোর সম্মিলিত প্রভাবে সবুজের মতো দৃশ্যমান রং তৈরি হতে পারে। এ কারণে গিরগিটির রঙের বিজ্ঞান আসলে জীববিজ্ঞান ও আলোকবিজ্ঞানের অসাধারণ সমন্বয়। তার ত্বক অনেক ক্ষেত্রেই শুধু রঙের পাত্র নয়, বরং আলোকে নিয়ন্ত্রণ করে দৃশ্যমান রং তৈরির একটি জীবন্ত ব্যবস্থা।
তাহলে গিরগিটি কেন এই জটিল ব্যবস্থা তৈরি করেছে? ছদ্মবেশ অবশ্যই একটি কারণ। গাছের ডাল, পাতা ও ঝোপঝাড়ের মধ্যে বসবাসকারী প্রাণীর জন্য পরিবেশের সঙ্গে কিছুটা মিশে থাকা শিকারি প্রাণীর চোখ এড়াতে সাহায্য করতে পারে। একইভাবে নিজে শিকার ধরার সময়ও অতিরিক্ত চোখে না পড়া সুবিধাজনক। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন। গিরগিটি সাধারণত কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে তার রং হুবহু নকল করে না। বরং অনেক প্রজাতির স্বাভাবিক রংই তাদের আবাসস্থলের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গিরগিটির রং পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো যোগাযোগ। মানুষের মুখের অভিব্যক্তি যেমন রাগ, আনন্দ, ভয় বা অস্বস্তির কিছু সংকেত প্রকাশ করে, তেমনি গিরগিটির শরীরের রং অন্য গিরগিটির কাছে তার বর্তমান অবস্থার তথ্য বহন করতে পারে। বিশেষ করে একই প্রজাতির দুই পুরুষ মুখোমুখি হলে রঙের পরিবর্তন অত্যন্ত নাটকীয় হতে পারে।
একটি পুরুষ গিরগিটি নিজের এলাকা বা সম্ভাব্য সঙ্গীকে কেন্দ্র করে অন্য পুরুষের মুখোমুখি হলে শরীরের রং দ্রুত উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন প্রজাতিতে এই সংকেতের ধরন ভিন্ন হলেও উজ্জ্বল হলুদ, কমলা, সবুজ, নীলচে বা বিপরীত রঙের দাগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখা যায়। এর সঙ্গে শরীরকে পাশ থেকে বড় করে দেখানো, মাথা উঁচু করা কিংবা অন্য ভঙ্গিও যুক্ত হতে পারে। উদ্দেশ্য অনেকটা প্রতিপক্ষকে বলা—আমি প্রস্তুত, আমার সঙ্গে সংঘর্ষে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এ ধরনের প্রদর্শনের বিবর্তনীয় গুরুত্ব বিশাল। প্রতিবার বিরোধ দেখা দিলেই যদি দুই গিরগিটিকে সরাসরি শারীরিক লড়াইয়ে নামতে হতো, তাহলে উভয়েরই আহত হওয়ার আশঙ্কা থাকত। দৃশ্যমান সংকেতের মাধ্যমে একজনের শক্তি, উত্তেজনা বা লড়াইয়ের প্রস্তুতি সম্পর্কে অন্যজন আগেই ধারণা পেতে পারে। ফলে অনেক বিরোধ প্রকৃত সংঘর্ষে পৌঁছানোর আগেই নিষ্পত্তি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও রং গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রজাতিতে পুরুষ গিরগিটি স্ত্রীকে আকৃষ্ট করার সময় স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল রং প্রদর্শন করে। সুস্থ, শক্তিশালী ও প্রজননের জন্য প্রস্তুত একটি পুরুষের রঙের প্রদর্শন সম্ভাব্য সঙ্গীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে। আবার স্ত্রী গিরগিটির রংও তার প্রজননগত অবস্থার তথ্য দিতে পারে। কিছু প্রজাতিতে স্ত্রী সঙ্গমের জন্য গ্রহণযোগ্য অবস্থায় এক ধরনের রঙের বিন্যাস এবং ইতিমধ্যে নিষিক্ত বা সঙ্গমে অনাগ্রহী হলে ভিন্ন ধরনের রং ও আচরণ প্রদর্শন করতে পারে।
এখানে রং যেন এক ধরনের নীরব ভাষা। কোনো শব্দ নেই, বাক্য নেই, কিন্তু শরীরের দৃশ্যমান পরিবর্তনই তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম। গিরগিটির ক্ষেত্রে রং তাই শুধু সৌন্দর্য নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থার অংশ।
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণও রং বদলানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। গিরগিটি শীতল রক্তের প্রাণী অর্থাৎ নিজের বিপাকীয় কার্যকলাপের মাধ্যমে স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো স্থির শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে না। পরিবেশের তাপ, সূর্যের আলো ও ছায়ার ওপর তার শরীরের তাপমাত্রা অনেকাংশে নির্ভর করে। সকালে শরীর ঠান্ডা থাকলে কিছু গিরগিটি তুলনামূলক গাঢ় রং ধারণ করতে পারে। গাঢ় পৃষ্ঠ সাধারণত বেশি সৌরশক্তি শোষণে সহায়ক হওয়ায় এটি শরীর দ্রুত উষ্ণ করার ক্ষেত্রে সুবিধা দিতে পারে।
আবার শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে তুলনামূলক হালকা রং ধারণ করা সূর্যালোকের একটি বড় অংশ প্রতিফলিত করতে সহায়তা করতে পারে। অবশ্য বিষয়টি শুধু গাঢ় বা হালকা হওয়ার সাধারণ নিয়মে সীমাবদ্ধ নয়; প্রজাতি, পরিবেশ এবং আচরণ অনুযায়ী পার্থক্য রয়েছে। গিরগিটি সূর্যের দিকে শরীরের অবস্থান পরিবর্তন, ছায়ায় চলে যাওয়া এবং রং পরিবর্তনের মতো একাধিক কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করে শরীরের তাপমাত্রা সামলাতে পারে।
গিরগিটির মানসিক ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গেও রঙের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ভয় পেলে, বিরক্ত হলে, প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হলে বা প্রজননসংক্রান্ত উত্তেজনায় তার শরীরের রঙে দ্রুত পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। ফলে কোনো গিরগিটির রং দেখে শুধু সে কোথায় বসে আছে তা নয়, কিছু ক্ষেত্রে সে কী ধরনের শারীরবৃত্তীয় বা সামাজিক অবস্থার মধ্যে রয়েছে, তারও ইঙ্গিত পাওয়া সম্ভব।
তবে মানুষের মতো সচেতনভাবে “এখন আমি নীল হব” বা “এখন সবুজ হয়ে লুকাব”—গিরগিটির প্রক্রিয়াকে এভাবে ভাবা ঠিক নয়। তার রং পরিবর্তনের ব্যবস্থা স্নায়ুতন্ত্র, হরমোন, ত্বকের বিশেষ কোষ এবং বাহ্যিক উদ্দীপনার সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। চোখে দেখা প্রতিদ্বন্দ্বী, সম্ভাব্য সঙ্গী, আলো, তাপমাত্রা কিংবা বিপদের মতো সংকেত শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যার ফল ত্বকে দৃশ্যমান হতে পারে।
গিরগিটির চোখও এই পুরো জীবনযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তার দুই চোখ অনেকাংশে স্বাধীনভাবে ভিন্ন দিকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। ফলে শরীর খুব বেশি না নাড়িয়েও চারপাশের বিস্তৃত এলাকা নজরে রাখা সম্ভব হয়। শিকার শনাক্ত করার পর দুই চোখ একই লক্ষ্যের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়ে দূরত্ব নির্ণয়ে সহায়তা করতে পারে। এরপর অত্যন্ত দ্রুত প্রসারিত জিহ্বার সাহায্যে শিকার ধরা হয়। অর্থাৎ গিরগিটির রং পরিবর্তনের ক্ষমতাকে আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে; তার চোখ, জিহ্বা, পা, লেজ, ধীর চলাচল এবং ত্বক—সবকিছু মিলেই বৃক্ষবাসী জীবনের জন্য অত্যন্ত বিশেষায়িত একটি দেহ তৈরি করেছে।
আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, গিরগিটি যে পৃষ্ঠে রাখা হবে সেই পৃষ্ঠের রংই ধারণ করবে। লাল কাপড়ে রাখলে লাল, নীল দেয়ালে রাখলে নীল—বাস্তবে এমন সরল অনুকরণ ঘটে না। প্রতিটি প্রজাতির একটি নির্দিষ্ট রঙের সম্ভার এবং পরিবর্তনের সীমা রয়েছে। তার ত্বকের গঠন ও বংশগত বৈশিষ্ট্য সেই সীমা নির্ধারণ করে। তাই একটি গিরগিটি এমন কোনো রং হঠাৎ তৈরি করতে পারবে না, যা প্রকাশ করার জৈবিক সামর্থ্যই তার নেই।
সব গিরগিটির রং বদলানোর ক্ষমতাও সমান নয়। পৃথিবীতে গিরগিটির বহু প্রজাতি রয়েছে এবং তাদের আকার, আবাসস্থল, মৌলিক রং ও রং পরিবর্তনের মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। কোনো কোনো প্রজাতির পরিবর্তন সূক্ষ্ম—সবুজ থেকে গাঢ় সবুজ বা বাদামি ধরনের। অন্যদিকে কিছু প্রজাতির পুরুষ সামাজিক বা প্রজননসংক্রান্ত প্রদর্শনের সময় এতটাই উজ্জ্বল ও বিপরীত রং ধারণ করতে পারে যে তাকে কয়েক মুহূর্ত আগের একই প্রাণী বলে মনে না-ও হতে পারে।
বিশেষ করে প্যান্থার গিরগিটির মতো কিছু প্রজাতি রঙের অসাধারণ বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। একই প্রজাতির মধ্যেও ভৌগোলিক জনগোষ্ঠী অনুযায়ী রঙের ধরনে পার্থক্য থাকতে পারে। আবার পুরুষ ও স্ত্রীর রঙের তীব্রতাও এক নয়। এর পেছনে যৌন নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা হয়। যে দৃশ্যমান সংকেত প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভয় দেখাতে বা সঙ্গীকে আকর্ষণ করতে কার্যকর হয়েছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই বৈশিষ্ট্য আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
গিরগিটির রং পরিবর্তনের গতি নিয়েও বিস্ময়ের শেষ নেই। এটি মানুষের ত্বকে রোদে পোড়ার মতো ধীর পরিবর্তন নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটতে পারে। কারণ নতুন রঞ্জক তৈরি করে পুরো ত্বকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয় না। আগে থেকেই থাকা ত্বককোষ এবং তাদের অণুবীক্ষণিক গঠনের পরিবর্তনের মাধ্যমে দ্রুত দৃশ্যমান ফল পাওয়া সম্ভব।
এই ব্যবস্থার আরেকটি চমৎকার দিক হলো, একই রং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশও ভিন্ন মাত্রায় পরিবর্তিত হতে পারে। তাই গিরগিটির রঙের ভাষা বুঝতে শুধু একটি রং দেখা যথেষ্ট নয়। প্রাণীটির প্রজাতি, লিঙ্গ, আচরণ, শরীরের ভঙ্গি, পরিবেশের তাপমাত্রা, আশপাশে অন্য গিরগিটির উপস্থিতি এবং রঙের পরিবর্তনের ধরন—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
গিরগিটির এই ক্ষমতা বিবর্তনের একটি অসাধারণ উদাহরণ। যে বৈশিষ্ট্য একদিকে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সাহায্য করতে পারে, সেটিই আবার সামাজিক সংকেত, প্রজনন এবং তাপ নিয়ন্ত্রণের মতো একাধিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রকৃতিতে একটি বৈশিষ্ট্য সব সময় একটি মাত্র উদ্দেশ্যের জন্য ব্যবহৃত হয় না। দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসে একই শারীরিক ব্যবস্থা বিভিন্ন সুবিধা দিতে পারে এবং সেই সুবিধাগুলোই প্রাকৃতিক ও যৌন নির্বাচনের মাধ্যমে আরও বিশেষায়িত হতে পারে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার সম্ভবত এটিই যে গিরগিটির রং পরিবর্তনের ঘটনায় জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, আচরণবিজ্ঞান ও বিবর্তন এক জায়গায় এসে মিলেছে। ত্বকের অতি ক্ষুদ্র স্ফটিকের বিন্যাস বদলাচ্ছে, আলো ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, স্নায়বিক সংকেত সেই পরিবর্তনকে প্রভাবিত করছে এবং শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান রং অন্য একটি গিরগিটির কাছে সামাজিক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। একই ব্যবস্থা আবার পরিবেশের তাপের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতেও ভূমিকা রাখছে।
তাই কোনো ডালে বসে থাকা গিরগিটিকে হঠাৎ গাঢ় থেকে উজ্জ্বল হতে দেখলে সেটিকে শুধু “পরিবেশের রং নকল করা” হিসেবে ব্যাখ্যা করলে এই প্রাণীর প্রকৃত বিস্ময়ের বড় অংশই অদেখা থেকে যায়। হয়তো সে শরীর গরম করার চেষ্টা করছে, হয়তো কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিজের শক্তি দেখাচ্ছে, হয়তো সম্ভাব্য সঙ্গীর কাছে সংকেত পাঠাচ্ছে, অথবা কোনো উদ্দীপনার প্রতি তার শরীর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।
গিরগিটির শরীরের রং তাই নিছক পোশাক নয়—এটি একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা, তাপ নিয়ন্ত্রণ, শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া এবং যোগাযোগের একটি জীবন্ত মাধ্যম। যে প্রাণীকে আমরা দীর্ঘদিন শুধু ছদ্মবেশের ওস্তাদ হিসেবে চিনেছি, তার ত্বকের নিচে আসলে কাজ করছে অণুবীক্ষণিক স্ফটিক, বিশেষায়িত কোষ, স্নায়বিক সংকেত এবং কোটি বছরের বিবর্তনে গড়ে ওঠা এক অসাধারণ ব্যবস্থা। প্রকৃতির ক্ষুদ্র একটি প্রাণীর শরীরেও যে কত সূক্ষ্ম প্রকৌশল লুকিয়ে থাকতে পারে, গিরগিটির রং বদলানোর বিজ্ঞান তার অন্যতম চমৎকার উদাহরণ।
মৌমাছি হারিয়ে গেলে পৃথিবীতে কী ঘটবে? প্রকৃতি, খাদ্যব্যবস্থা ও মানুষের জীবনে তাদের অপরিহার্য ভূমিকা
ক্যাঙ্গারু কেন পিছনের দিকে সহজে হাঁটতে পারে না? অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত প্রাণীর বিস্ময়কর অজানা তথ্য
সাদা হাঙরের রহস্যময় ‘ক্যাফে’: প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে কেন জড়ো হয় গ্রেট হোয়াইট শার্ক?
সিংহকে কেন জঙ্গলের রাজা বলা হয়? বাস্তবে কোথায় থাকে এই শক্তিশালী শিকারি?
ডলফিন কি একে অপরকে নাম ধরে ডাকে? তাদের ভাষা, স্মৃতি ও বুদ্ধিমত্তার বিস্ময়কর জগৎ
পেঁচা কীভাবে প্রায় নিঃশব্দে উড়তে পারে? রাতের শিকারির গোপন প্রযুক্তির রহস্য